Loading...

Saturday, 20 June 2020

অনুভবে (গল্প ও ঘটনা)







অনুভবে
      
   জয়িতা সরকার



কত সবুজ, কত নীল চারপাশটা কত সুন্দর তাই না মা? কবে যে বাইরে প্রাণভরে একটু খেলা করব, না না এই আতংকিত পরিবেশে আর বাইরে যাওয়ার কথা বলো না। না মা আমি তোমার সঙ্গে সঙ্গেই থাকব। একা কোথাও যাব না। ঠিক আছে ঠিক আছে, অনেক পাকা পাকা কথা হয়েছে, এখন চুপটি করে থাকো তো। আমাকে আবার বাইরে যেতে হবে, খাবার জোগাড় করতে হবে। আমিও তোমার সঙ্গে যাব মা, সেতো যাবেই, তোমাকে রেখে তো আমার কোথাও যাওয়ার জো নেই। 

আর কতক্ষণ বলতো মা, এভাবে ঘুরতে আমার একদম ভাল লাগছে না, চলো ফিরে চলো। ছোট্ট সোনার আবদারে ফিরে এলো আস্তানায়। পশ্চিম আকাশ লাল করে সন্ধ্যে নামল দূরের গ্রামে। দেখো মা, গ্রামটা কী ভাল লাগছে এই সন্ধ্যেতে। একদিন ওখানে নিয়ে যাবে আমায়? হ্যা গেলেই হয়। আচ্ছা এবার একটু শান্ত হয়ে থাকো দেখি। কিন্তু সেতো শান্ত হওয়ার অর্থই বুঝতে শেখেনি। ও মা একটা গল্প বলো না, ফের বায়না, বলো,  একটা গল্প বলো। আচ্ছা বাছা শোন মন দিয়ে...

সে কতশত যুগ আগের কথা, আমি কিন্তু অত সময় দিন ক্ষণ জানিনে। তবুও বলি- তখন এক অন্য ভারত। রাজাদের দেশ, জহর মণি মানিক্য তে মোড়া আমাদের ইতিহাস। সেই ভারতে এক বিখ্যাত রাজ্য হস্তিনাপুর। গৌরব তার শিখরে। কিন্তু লড়াই বাঁধল কে পরবর্তী রাজা হবে। শুরু হলো যুদ্ধ। সে এক মহারণ। কত হাতি, কত ঘোড়া, কত বড় বড় যোদ্ধা। লড়াই চলছে দুই পক্ষের। একদিকে পান্ডব অন্যদিকে কৌরব। লড়াই লড়াই...

মা তুমি কেন ঘুমিয়ে পড়লে বলো গল্পটা। তারপর কী হলো? মায়েদের এই এক দোষ, কেনো যে এতো ঘুম আসে চোখে? বাচ্চাগুলো দিব্যি জেগে আছে, মা গেল ঘুমিয়ে। ওঠো মা, গল্প বলো। আহা সেদিন যদি চোখে ঘুম না আসত, তাহলে আমার বাছার প্রাণ টা যেত না। আমিই দোষী...এক আকাশভেদী চিৎকারে কেঁপে উঠেছিল কুরুক্ষেত্রের মহারণ। হয়ত সেদিন নিজের ঘুমকেই চিরশত্রু মনে করেছিল অর্জুনপত্নী। 

বাবা মায়ের গল্পখানা চুপটি করে বেশ শুনছিল সে। মায়ের জঠরে থেকেই বেশ রণকৌশল আয়ত্ত্ব করছিল, কিন্তু মা ঘুমিয়ে পড়ল মাঝপথে। অনেকবার ডেকেও ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি মায়ের। আর কী সেই অর্ধ শেখা রণকৌশল নিয়েই নেমেছিল রণাঙ্গণে। নিজের কৌশলে ঢুকে তো পড়ল সেই চক্রব্যূহে। উফফ তারপর সেই কঠিন লড়াই। চারিদিক থেকে ঘিরে ধরল তাকে। যুদ্ধ এর সেদিন আর কোনো নিয়ম রইল না। নীতি সেদিন হেরেছিল অনীতির কাছে। অধর্ম সেদিন ধর্মের খোলস পড়েছিল। একের পর এক বাণে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল অভিমুন্য। তার আর্তনাদেই তৈরি হল ধর্মের জয়ধ্বনি। 

বাহ! মা কী সুন্দর গল্প, আমিও এরকম যোদ্ধা হবো। ধুর বোকা, এখন ওসব নেই। এটা তো কলিযুগ। এখন এভাবে সন্মুখ সমর নেই। এখন ব্যালট বক্স যুদ্ধ। এখন তো রাজতন্ত্র নেই, গণতন্ত্র। আমরা সবাই সমান, সবাই ভোট দেয়, এখন ঘুমিয়ে পড়ো তো, তোমার এসবের ঢের দেরি আছে। এসব কঠিন বিষয়ে ভাবার অনেক সময় পড়ে আছে। মায়ের আদরে চুপটি করে ঘুমিয়ে রয়েছে সে। মা ও কী ভীষণ যত্নে আগলে রেখেছে তাকে। 

উফফ মা বড্ড খিদে পেয়েছে, কিছু খাবার তো দেবে নাকি? আজ শরীরটা বড্ড ক্লান্ত , একদম কাজ করতে পারছি না। হাঁপিয়ে যাচ্ছি সোনা। কিন্তু আমার তো খিদে পেয়েছে। সন্তানের খিদে মেটাতে অগত্যা অবসন্ন শরীরেই বাইরে বেরোতে হল। ঘরে খাবার বাড়ন্ত, তাই ঘর ছেড়ে বাইরে, হেঁটে চলছে এদিক ওদিক, না কেউ কিছুই দিচ্ছে না। ওদিকে তীব্র খিদেতে ছটফট করছে সন্তান। খাবারের সন্ধানে শেষে ওই গ্রামে, মা যেটা আমরা দূর থেকে দেখেছিলাম সেদিন সেখানে এলাম তো। হ্যা লোকজন ভালোই আছে, কিছু না কিছু নিশ্চয়ই পাবো এবার। 

কিছু খেতে দেবে গো? বড্ড খিদে পেয়েছে, শুনতেই সামনে হাজির মন্ডা মিঠাই। দেখেই জিভে জল, কতদিন এসব খাইনি আমরা। টপাটপ মুখে পুড়তে লাগল, মুহুর্তেই গুড়ুম গুড়ুম শব্দ, আর চারপাশে হাততালি। ও মা, কী হলো? আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তোমার মুখে কি রক্ত ঝরছে। মা ওগুলো মিষ্টি নয়? ওরা আমাদের ঠকালো মা। জঠরের সন্তান নিয়ে প্রাণপণে এদিক ওদিক ছুটছে সে। একদিকে নিজের বড় দেহ, তার ওপর সন্তানসম্ভবা, উফফ কি যন্ত্রণা। মুক্তি কোথায়? মা এটা কী সেই চক্রব্যূহ? কোনো উত্তর দিতে পারছে না মা এই মুহূর্তে। রক্ত ঝড়ছে মুখ দিয়ে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। 

নিজেকে একটু স্বস্তি দিতে নেমে গেল জলে। কিন্তু তাতে জ্বালা কমেনি একবিন্দুও। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই মা? যদি আমি তোমার ভেতরে না থেকে পাশে থাকতাম এই যুদ্ধ আজ জিতেই ফিরতাম। ওরা তোমাকে একা পেয়ে অন্যায় ভাবে মেরেছে আমাদের। মা ওরা উল্লাস করছে। মা, ও মা, আমরাও জানি
 না এই ব্যূহ থেকে বেরোনোর পথ। মা কথা বলো, মা নীরব, উত্তর নেই তার কাছে। এও এক ধর্ম অধর্ম এর খেলা। নির্মমতার কলিরূপ। 

নিজের সঙ্গে লড়াই করছিল নিজেই। কিন্তু সভ্য সমাজের কাছে হার মানল জংলী। জলেই রইল মা আর সন্তানের ভালবাসা।

No comments:

Post a comment

Thanks for your comment.

Sponsored AD Space

Sponsored AD Space
See Your AD Here